
ভৈরব প্রতিনিধি :
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে গোপনে গড়ে উঠেছে একাধিক ভেজাল মসলা কারখানা, যেখানে নিম্নমানের উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন প্রকার মসলা। এসব মসলা বাজারে পৌঁছে সাধারণ মানুষের অজান্তেই তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মসলার নামে বিষ খাচ্ছে ভৈরববাসী
মসলার স্বাদ ও গন্ধে বাঙালির খাবার অপরিহার্য। কিন্তু সেই মসলার ভেতর যদি থাকে ইটের গুঁড়া, কাপড়ের রং কিংবা ক্ষতিকর কেমিক্যাল, তাহলে? বাস্তবতা হচ্ছে, ভৈরবের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এমন ভেজাল মসলা তৈরি করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভৈরবে বেশ কয়েকটি কারখানায় গোপনে নিম্নমানের উপকরণ মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে গুঁড়া হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, জিরাসহ নানা প্রকার মসলা। এদের মধ্যে হাসিম মিয়া- সম্রাট- হামিদ, মুছা, বিজয় বাবু, মিশুক, ফরহাদ এর মশলা কারখানায় ভেজাল মশলা তৈরি হয়।
ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় এসব মসলায় মিশিয়ে দিচ্ছে রঙিন পাউডার, খোসা, চালের গুঁড়া, এমনকি ইটের গুঁড়োও।
স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া এসব মসলার বেশিরভাগই খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়, যেখানে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ নেই। বাজারের অনেক খুচরা বিক্রেতা অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু মিল মালিক এসব মসলার গুঁড়া তৈরি করে নামীদামি ব্র্যান্ডের মোড়কে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করছে।
ভোক্তাদের উদ্বেগ
ভেজাল মসলার কারণে সাধারণ মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে, পাকস্থলীর সমস্যা, লিভার ও কিডনির জটিলতা, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা জানিই না, কোনটা আসল আর কোনটা নকল! বাজার থেকে দাম দিয়ে কিনে আনি, কিন্তু বাড়িতে এসে দেখি মসলার স্বাদ অস্বাভাবিক। আমরা কি তাহলে দিনের পর দিন বিষ খাচ্ছি?
একইভাবে, গৃহবধূ সালমা আক্তার বলেন,
খাবারে ঠিকঠাক গন্ধ আসে না। মরিচের রঙও পানিতে ধুয়ে যায়! ছোট বাচ্চারা এসব খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অথচ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
প্রশাসনের বক্তব্য
স্থানীয় প্রশাসন বলছে ভৈরবে ভেজাল মসলার কারবার বেড়েছে। এ বিষয়ে কথা বললে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শবনম শারমিন বলেন, আমাদের অভিযান পরিচালনা চলমান রয়েছে। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হলে নিয়মিত অভিযান এবং জনসচেতনতা জরুরি। ভেজাল মসলা উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভেজালবিরোধী অভিযানে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, শুধুমাত্র অভিযান চালালেই হবে না, এই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
এ বিষয়ে ভৈরবের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ভেজাল মসলা খেয়ে যদি মানুষ অসুস্থ হয়, তাহলে প্রশাসন দায় নেবে? শুধু জরিমানা করলে হবে না, তাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন,
সব ব্যবসায়ী কিন্তু ভেজাল মসলা বিক্রি করে না। আমরা চাই, প্রকৃত দোষীদের শাস্তি হোক, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
জনসচেতনতা এবং করণীয়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। এছাড়া খোলা ও অস্বাভাবিক রঙের মসলা কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিএসটিআই অনুমোদিত ব্র্যান্ডের মসলা কিনতে হবে। সন্দেহজনক কিছু দেখলে প্রশাসনকে জানাতে হবে।
ভৈরবে ভেজাল মসলা নিয়ে প্রশাসন কতটা কঠোর হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব এই ভেজাল কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।