পরিবেশের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে?

পরিবেশের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে

এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘ল্যান্ড রেস্টোরেশন ডেজার্টিফিকেশন অ্যান্ড ড্রাউট রেজিলিয়্যান্স’। বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পবির্তন মন্ত্রণালয় থেকে এর ভাবার্থ করা হয়েছে– ‘করব ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখব মরুময়তা, অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’। বস্তুত প্রতিপাদ্যজুড়ে রয়েছে এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার পরোক্ষ আহ্বান। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে তাই আরও কিছু স্লোগান নিয়ে। যেমন– ‘একটাই পৃথিবী, একটাই সুযোগ, আমাদের ধরিত্রীকে রক্ষা করো; চলো একটা সবুজ পৃথিবীর জন্য আবারও চেষ্টা করি’।

প্রতিপাদ্য বা পরিবেশ দিবসের মূল ভাবনার প্রত্যয়গত দিক নিয়ে যদি আলোকপাত করি, সবার আগে আসে রেস্টোরেশন বা ‘পুনরুদ্ধার’ শব্দটি। এ থেকে বোঝা যায়, আমরা কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি, যাকে উদ্ধার করতে হবে। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে এটি একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা যে বাস্তুসংস্থানে প্রাকৃতিকভাবে বসবাস করতাম, তাকে ফিরিয়ে আনা। যেটি করতে হলে আমাদের প্রতিবেশ ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়েছে বা জীববৈচিত্র্য থেকে সব বাধা দূর করতে হবে। ভূমি পুনরুদ্ধারের মধ্যে পুনর্বাসন প্রতিস্থাপন, এমনকি ভূমি দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করাও একটি প্রক্রিয়া। কারণ, পুনরুদ্ধার শুধু আবর্জনা পরিষ্কার করা নয় বরং টেকসই পরিবেশগত উন্নয়নের মাধ্যমে একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মঙ্গল নিশ্চিত করা।

ডব্লিউ জি নিউজের সর্বশেষ খবর পেতে https://worldglobal24.com/latest/ গুগল নিউজ অনুসরণ করুন

আমাদের দেশে শুধু স্থলভূমি নয়, জলাভূমিগুলোও দখল হয়ে গেছে। সেগুলোর পুনরুদ্ধারে আমরা সফল হবো কি? কিছু উদাহরণ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। যেমন বুড়িগঙ্গা থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত নৌপথে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি করা। তবে জলাধার যদি শুকিয়ে যায় তার জন্য শুধু চলাচল ব্যবস্থা বা দখলমুক্ত করাই মুখ্য নয়। ওই স্থান ও আশপাশের সব এলাকার একটি পরিবেশ মানচিত্র করা প্রয়োজন। যাতে ওই জলাধারের গুণগত মান কী কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেমন নদীতীরে প্রাকৃতিক বন উদ্ধার করতে হবে। অর্থাৎ আবার সেই প্রতিবেশ অনুযায়ী সবুজায়ন করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা।
ভূমি ও জলাধার ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে জলজ প্রজাতির বিচরণও পুনরুদ্ধার করতে হবে। সেই মাছ, সেই শুশুক আবার যদি উঁকি দেয় তবে পুনরুদ্ধার সফলতা পাবে। তাই আমাদের নিজেদেরই এ প্রশ্ন করতে হবে, ভূমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য কী? লক্ষ্য প্রাকৃতিক, লোকায়ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা ও কার্যকর রাখা। এ জন্য প্রয়োজন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেওয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতা থেকে ধার করে বলতে পারি: ‘আমাদের গেছে যে দিন/ একেবারেই কি গেছে,/ কিছুই কি নেই বাকি।’

অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন
অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন

 

পুনরুদ্ধার বিজ্ঞানের সহায়তায় ইতিহাস জেনে বর্তমানে কী পরিস্থিতি, এর পরিণতি কী হতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে ভূমি পুনরুদ্ধারমূলক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। ৫০ বছর ধরে যেভাবে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেভাবে কি পরিবেশদূষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন রোধ সম্ভব হয়েছে? সেটি হয়নি সমন্বিতভাবে জল, স্থল ও জীববৈচিত্র্যের সহ-‌উপাদানগুলোকে একই মাত্রায় গুরুত্ব না দেওয়ায়। মানব প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে যাবে বলে মানুষের মঙ্গলের জন্য অন্যান্য প্রজাতি কি আমরা বিলীন করে দেব? আমরাই ভূমি দখল করে তৈরি করেছি নিজেদের আবাসস্থল। সবুজায়ন করতে হবে বলে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে বৃক্ষরোপণের নামে বপন করেছি আগ্রাসী প্রজাতি।

প্রাকৃতিক বনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাংলাদেশের সুন্দরবন। পৃথিবীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক নোনাবন আমাদের সুন্দরবন। এককালে এর ব্যাপ্তি ছিল চকরিয়া পর্যন্ত, যা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে। গত এক যুগের বেশি সময় হলো সুন্দরবনের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনায় ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বেষ্টনী রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিডর ও আইলার পর থেকে আরও বেশি নজরদারি করা হচ্ছে এই প্রাকৃতিক বন রক্ষায়।

আরও পড়ুন: দুর্নীতিবাজ আর ঘুষখোরদের নাম মুখে নেয়া যেন পাপ

ভূমি পুনরুদ্ধার, জলাশয় ভরাট রোধসহ জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের কৌশলপত্র, নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। নতুন আইন তৈরির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নাজুকতা রোধে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন অভিযোজন কৌশল। দুর্যোগ-সহনশীল জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের লোকায়ত জ্ঞান ও অভিযোজন কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার পরও আমরা ভূমি পুনরুদ্ধার করতে পারি না। নানা জটিল সমীকরণের কাছে পরাজিত হতে হয়। ভূমি পুনরুদ্ধারের সুফল বনজ, মৎস্য, বন্যপ্রাণীসহ অন্যান্য প্রজাতি, যাদের ওপর নির্ভর করছে আমাদের প্রকৃতি ও মানব জাতি– সবাই প্রাপ্য হবে।
এ বছরের প্রতিপাদ্যে মরুময়তা ও খরাসহিষ্ণুতা বা সহনশীলতার প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মরুময়তা নিয়ে বাংলাদেশে তেমন আলোচনা সচরাচর হতে দেখা যায় না। যদিও পরিবেশ ও দুর্যোগ বিজ্ঞানে পঠনপাঠন হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মরুময়তা বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণও আমরা চিহ্নিত করে থাকি, যা ভূমি ও জলাধারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
যেমন ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন। ভৌগোলিক কারণে নাজুক বাংলাদেশ নিজে যতটা না করে, প্রতিবেশী উচ্চ অববাহিকায় অবস্থিত দেশগুলো তার চেয়ে বেশি করে থাকে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণতা বৃদ্ধি এর প্রমাণ। দেশের অভ্যন্তরে ভূগর্ভস্থ পানির সঞ্চয় বাড়াতে না পারলে মরুময়তা ও খরা আরও বৃদ্ধি পাবে।

আমাদের ভৌগোলিক আর্থসামাজিক ও ঐতিহাসিক দিক পর্যালোচনায় দেখা যায় ভূপ্রকৃতি ভূমিক্ষয়, জলসংকট, জলসম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার, নিবিড় চাষাবাদ, জনসংখ্যার চাপ, অতিনগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন– এসবের সম্মিলিত নেতিবাচক প্রভাবেই ভূমির অবক্ষয় হয়ে থাকে। যার পরিণতির শেষ পর্যায়ে মরুময়তা, তাই প্রাকৃতিক বনশূন্যতা রোধ, মাটির ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার বন্ধ করে পূর্বে প্রাকৃতিক জৈব ফিরিয়ে আনা, ভূমি বা জলাধার ভরাট রোধ, ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়েই পরিবেশ দিবসের সঠিক প্রতিপাদ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে হলে আগামী প্রজন্মকে এ বিষয়ে সচেতনও হতে হবে।

লেখক

অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ; উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়  

Recommended For You