নির্বাচন ঘিরে মর্যাদার লড়াইয়ে দুই রাজনৈতিক পরিবার, কে হাসবে শেষ হাসি?

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সাধারণ ভোটারদের সাঝে ভয়-ভীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেড়েছে প্রসাশনের মধ্যে উৎকন্ঠা, তবে যেকোন মুল্যে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে প্রয়োজনীয় আইনগত যত রকম পদক্ষেপ নেয়ার দরকার প্রশাসন সকল প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে বলে একাধিক সুত্রে জানা যায়।
বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, চলতি সালে দেশের যে কোন উপজেলা নির্বাচনের চাইতে আনোয়ারার ৭৪টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে সব গুলো কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন,তবে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে ভোটের দুই দিন আগে থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় চাদরে ঢাকা থাকবে আনোয়ারা প্রতিটি কেন্দ্র,এ ছাড়াও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে থাকবে বিজিবি ও র‍্যাব।আনোয়ারার প্রতিটা ইউনিয়নের ভোট কেন্দ্র সমুহের জন্য ভোটারদের নিরাপত্তার জন্য তিন শত পুলিশ সদস্য রাখা হলেও অতিরিক্ত আরও তিনশত পুলিশ চাওয়া হয়েছে বলে নির্বাচন উপজেলা নির্বাচন কমিশন সুত্রে জানা যায়।সুত্রটি আরো জানায়, নির্বাচন সুষ্ট ভাবে সমাপ্ত করা জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ও বাড়ানো হবে।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী চেয়ারম্যান পদে ৫ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেন। মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই শেষে সবাইকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। চেয়ারম্যান পদে বৈধ পাঁচ প্রার্থী হলেন বর্তমান চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক এম এ মান্নান চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আবুল কালাম চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কাজী মোজাম্মেল হক, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সদস্য ছাবের আহমেদ চৌধুরী।এদিকে, গত ১২ মে চেয়ারম্যান পদে দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আবুল কালাম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সদস্য ছাবের আহমেদ চৌধুরী তাদের মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে নিলে ঘুরে যায় রাজনৈতিক হাওয়া।
এই দুই প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ৩ জন। তারা হলেন, বর্তমান চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল মন্নান চৌধুরী, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি কাজী মোজাম্মেল হক।এর পর শুরু হয় রাজনৈতিক নাটক,পর্দার আড়ালে থেকে আনোয়ারার নির্বাচন পরিচালনা করছে মুলত:দুই রাজনৈতিক পরিবার।এই নির্বাচন দুই পরিবারের অস্তিত্বের লড়াই।
এ নির্বাচনে এক দিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাবু পরিবারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও বর্তমান সাংসদ সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ওআর অন্যটির কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান এমপি। তন্মধ্যে এলাকাবাসির সুত্রে জানা৷ যায়,প্রথম থেকে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান কাজী মোজাম্মেল হককে (আনারস) ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এম এ মান্নান চৌধুরীকে (মোটরসাইকেল) সমর্থন দিয়েছেন,এরি মধ্যে সোমবার (১৩ মে) সন্ধ্যা ৭টায় আনোয়ারা কালা বিবি দিঘির মোড়ে উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী তার নির্বাচনী অফিসে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে আনোয়ারায় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তথা গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভা বলেছেন,আমি মন্ত্রী এমপির প্রার্থী নই জনগণের প্রার্থী। জনগণই আমার শক্তি। জনগণকে সাথে নিয়ে নির্বাচনী মাঠে থাকবো। সুষ্ঠু ভোট হলে জনগণ বিপুল ভোটে আমাকে নির্বাচিত করবে।
এর পর নাটকীয় ভাবে বাবু পরিবার সমর্থিত দুই প্রার্থী হওয়ায় অনেকটা এই পরিবার থেকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলে এই দুই প্রার্থীকে নিয়ে আনোয়ারার বাবু পরিবারের নেতাকর্মীদের সমন্বয় করার উদ্যোগ নেন সাংসদ সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। এ উপলক্ষে গত ২০ মে সন্ধ্যায় সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সার্সন রোডস্থ বাসভবনে বর্তমান চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ মান্নান চৌধুরীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সমন্বয় সভা করেন। সেখানে নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে তৌহিদুল হক চৌধুরীকে নতুন করে সমর্থন দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী ও আরেক প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ মান্নান চৌধুরী। এসময় মান্নান চৌধুরীসহ সকলকে নেতাকর্মীদের সমন্বয় করে তৌহিদুল হক চৌধুরীকে সমর্থন দিতে বলেন। তৌহিদুল হক চৌধুরীকে বিজয় করতে এক যোগে সবাইকে কাজ করতে নির্দেশনা দেন সাংসদ সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। নেতার নির্দেশ মতে সবাই এক যোগে কাজ করার অঙ্গিকার করলে মাঠ পর্যায়ে সাধারণ সমর্থকের মাঝে নেমে আসে হতাশা,ঘুরে যাই নির্বাচনের মেরুকরণ। সাবেক ও বর্তমান দুই মন্ত্রীর প্রভাবে আনোয়ারায় এবারের উপজেলা নির্বাচন পেয়েছে অন্যমাত্রা। সেই সাথে ভোটকে ঘিরে বেড়েছে আতংক, উত্তেজনা। সাধারণ ভোটারেরা আগ্রহ করে আছে জমজমাট একটি নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে।
এদিকে, দুই পক্ষই ভোটের প্রচারণায় বহিরাগতের আনাগোনা নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন সাধারণ ভোটাররা। এক পক্ষ অপর পক্ষকে নানা অজুহাতে আতংক ছড়াচ্ছে। বহিরাগত এনে মহড়া দিচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। আনারস প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজী মোজাম্মেল হকের পক্ষে ভোটের মাঠে থাকা একজন প্রবীন আওয়ালীগ নেতা বলেন,বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার দিন শেষ।যারা বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা বেকার রাজ্যে বাস করতেছেন। এ সব অবান্তর স্বপ্ন না দেখে গোলামীর জিন্জির হতে বেরিয়ে এসে আনোয়ারাবাসীকে একটা সুন্দর নির্বাচন উপহার দিই। আনোয়ারাবাসী জানে বিগত সময়ের লুটপাঠের ইতিহাস।আনোয়ারার মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে, তারা পরিবর্তন চায়।সন্ত্রাসের অবসায়ন চায়। যদি কোন অপশক্তি নির্বাচনে প্রভাব দেখিয়ে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে তাহলে শান্তিপ্রিয় আনোয়ারার জনগন সমুচিত জবাব দেবে।
এদিকে,আনোয়ারা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবু জাফর সালেহ ঝুঁকি বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন,দেশের অন্য এলাকার নির্বাচনের চাইতে আনোয়ারার নির্বাচন অনেক গুরুত্বপূর্ণ,আমাদের তদন্তে বেশ কিছু কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ভোটের দুই দিন আগে থেকে নিরাপত্তার চাদরের ঢাকা থাকবে আনোয়ারা উপজেলা। আমরা বিভিন্ন মহল থেকে যেসব অভিযোগ পাচ্ছি তা দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তিনি বলেন,বিগত সংসদ নির্বাচনে কোনো কোনো কেন্দ্রে ১জন পুলিশ দিয়ে নির্বাচন হয়েছে। এবার চারজন বা তারও বেশি পুলিশ থাকবে। পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে বিজিবি ও র‍্যাব থাকছে। প্রতি ইউনিয়নে একজন করে মোট ১১জন ম্যাজিস্টেট থাকার কথা থাকলেও ম্যাজিস্ট্রেটও বাড়ানো হচ্ছে। ভোটারদের জন্য ভোট নির্বিঘ্নে করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।এলাকার গুরুত্ব বিবেচনায় ৫/১০টি কেন্দ্রের জন্য একটি করে মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করবে। এদিকে নির্বাচন ঘিরে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী গতকাল শুক্রবার উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রচারণা চালিয়েছেন। দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন।
বিভিন্ন ইউনিয়নের ভোটারদের সাথে আলাপ কালে জানা যায়,বিগত গত দশ বছর কোন প্রার্থী আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসেনি, এমনকি কোন প্রার্থীকে ভোটের সময় চোখেও দেখিনি। এখন ভোটারদের কদর বেড়েছে, সবাই ঘরে ঘরে আসছে ভোট চাইতে, নিজেকে এখন নাগরিক নাগরিক মনে হচ্ছে।সবাই আসছে ভোট চাইছেন, বিগত কত বছর এই দৃশ্য দেখিনি। ভোট যে মানুষের কাছে ঈদের আনন্দের মত সেটা এবার উপজেলা নির্বাচনে আবারও প্রমাণিত। কারন বিগত ১০/১৫ বছর এরকম আমেজে ভোট আর হয়নি। এখন সবাই ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইতে বাধ্য হচ্ছে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের জনগন আনোয়ারাবাসি দিকে চেয়ে রয়েছে আগামী ২৯মে কাকে তাদের মুল্যবান রায় দিচ্ছে, নির্বাচনকে ঘিরে মর্যদার লড়াইয়ে দুই রাজনৈতিক পরিবারের দুই সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী। কে হাসবে শেষ হাসি?

Recommended For You