আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েও ভোটযুদ্ধে ফেল করতে পারে ১২৭ এমপি

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র একদিন বাকি। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ মোট ২৭টি দল অংশ নিচ্ছে। তবে ১২৭টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী।
প্রভাব প্রতিপত্তি, নিজস্ব লোকবলের কাছে এই আসনগুলোতে পাত্তা পাচ্ছে না জাতীয় পার্টি বা অন্য ছোট দলগুলোর প্রার্থীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এবারের নির্বাচনে আর যাই হোক আওয়ামী লীগের কাছে একটি বার্তা সুস্পষ্ট। সব বিবেচনায় এই দল যাদের প্রার্থী দিয়েছে তাদের মাঠের পরীক্ষায় যোগ্যতা কতটুকু। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে এমন অনেক এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে এবং সরেজমিন পরিদর্শন করে জানা যায়, সাধারণ মানুষের এক তৃতীয়াংশের ভোটে তেমন আগ্রহ নাই। যারা নির্বাচন না করা দলের কট্টোর সমর্থক কর্মী। দুই তৃতীয়াংশ জনগণ ভোটের বিষয়ে আগ্রহী। তবে প্রতিরোধ প্রতিবন্ধকতা আসলে সাধারণ জনগণ ভোট দিতে কম যাবে। চট্টগ্রামের ১১ সংসদীয় আসনের একটি ফ্লাট বাড়িতে দারোয়ানের চাকরি করা ছালাম আমিন। তিনি জানান, ভোট দেয়াটা আনন্দের। পাঁচ বছরে একবার সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ আসে। বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ গ্রহন করলে নির্বাচন আরো উৎসব মূখর হতো।কিন্তু মারামারি হলে কিংবা কেউ ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দিলে, ভোট দিতে যাব না। এই কথা অনেক সাধারণ মানুষের। রাজধানীর গুলশান থানা এলাকায় রিক্সা ভ্যানে তরকারি বিক্রেতা মামুন সরকার জানান, নির্বাচন আসলে একটা উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। তবে রাজনৈতিক নেতাদের দলীয় কোন্দল হানাহানি সংঘর্ষের পর্যায়ে পৌছালে আমাদের কষ্ট হয়। শান্ত পরিবেশ থাকলে ভোট দিতে যাব। আর্মি নামাইছে শুনছি। তারা ঠিকভাবে কাজ করলে মারামারি হওয়ার সুযোগ নাই।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্তমান ২৮ জন সংসদ সদস্য দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন। জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়র পদ ছেড়ে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন; এমন প্রার্থী ৩৫ জন। এঁদের বাইরে সাবেক সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী আরও অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এঁরা সবাই ‘দলীয় স্বতন্ত্র’ হিসেবে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাশ মাঠ পরীক্ষায় ফেল করার বিষয়ে, বাংলাদেশ ফেডালে সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক মহসীন কাজী এই প্রতিবেদককে বলেন, ৭১ পূর্ববর্তী রাজনৈতিক নেতা কমীর্রা আদর্শিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন।
চট্টগ্রাম জননেতা এম এ আজিজ আন্দরকিল্লা এলাকার একটি কক্ষের অর্ধেকে তিনি ছোট্ট একটি খাটিয়ায় ঘুমাতেন বাকি অংশটি আওয়ামী লীগের মহানগর কার্যালয়। নিজে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও একেবারে সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তিনি বলেন, তখন মানুষ দেশের জন্য স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে পিছপা হননি। আর এখনকার অনেক সাংসদ নিজের ক্ষমতা ও দাপটে পুরো এলাকার মানুষকে তটস্থ করে রাখেন। কার বাড়িতে কত মূল্যবান আসবাব, কার গাড়ী কত দামী আধুনিক তার প্রতিযোগিতা চলে। রাস্তায় চলাফেরার সময় সাইরেন বাজিয়ে যানজট সৃষ্টি করাটা বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি হয়ে দাড়িয়েছে।
সাধারণ জনগণ কিন্ত নিরব পর্যবেক্ষক। তারা সুযোগ পেলে নিজের সঠিত মতামতের প্রতিফলন ঘটাবে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন কিন্তু মাঠের কঠিন পরীক্ষায় নাস্তানাবুদ হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে জন বিচ্ছিন্নতা। নিজের দলীয় লোকজন ক্যাডার দিয়ে নিজস্ব ক্ষমতার বলয় সৃষ্টি করা। তার উপর সম্পদের জ্যামিতিক বৃদ্ধিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, এই সব বিবেচনায় অনেক মন্ত্রী সাংসদ নির্বাচনের মাঠের পরীক্ষায় ফেল মারবেন এটাই স্বাভাবিক।সংসদীয় আসনগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং রাজনৈতিক নেতা—কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত ৮০টি আসনে দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার সামর্থ্য রাখেন। যা মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে। কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী নির্বাচনী দৌড়ে ইতিমধ্যে পিছিয়ে পড়ার চিত্র দেখা গেছে। ভোট উৎসবমুখর করার জন্য দল সিদ্ধান্ত নিয়েই দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। জনপ্রিয় ব্যক্তিকে জনগণ বেছে নেবে তাতে কে হারল, কে জিতল, তা নিয়ে আওয়ামী লীগ চিন্তিত নয়।
এই বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মির্জা মো. আজিজুল ইসলাম একটি দৈনিকের সাক্ষাতকারে বলেন, নির্বাচনের আগে সামগ্রিক যে পরিস্থিতি, সেটিকে আমার কাছে শান্তিপূর্ণ মনে হচ্ছে না। একধরনের শঙ্কা রয়েছে মানুষের মনে। নির্বাচন হয়ে যাবে, সেটি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। কিন্তু নির্বাচন—পরবর্তী পরিস্থিতি কী হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে কি না, এসব নিয়ে শঙ্কা আছে। এ ধরনের শঙ্কা দেশের সামগ্রিক ও অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখকর নয়। অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে সামগ্রিকভাবে দেশে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সরেজমিন পরিদর্শন ও তথ্যনুসন্ধানে দেখা যায়, এবারের সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ১৯টিতে, চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৮ আসনের মধ্যে ২১টিতে, ঢাকা বিভাগের ৭০ আসনের মধ্যে ২৭টিতে, বরিশাল বিভাগের ২১ আসনের মধ্যে ৭টিতে, ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ আসনের মধ্যে ১৩টিতে, রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের মধ্যে ১২টিতে, রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে ২০টিতে এবং সিলেট বিভাগের ১৯ আসনের ৯টিতে নৌকার প্রার্থীদের সঙ্গে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।। এঁদের অনেকে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
একই অবস্থা ১৪—দলীয় জোট শরিকদেরও। এবারের নির্বাচনে এই জোটের শরিকদের আওয়ামী লীগ যে ছয়টি আসন দিয়েছে, সেগুলোতে তাঁরা ভোট করবেন নৌকা প্রতীকে। আওয়ামী লীগের সূত্র জানায়, জেলা হিসেবে ময়মনসিংহ, নরসিংদী, গাজীপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্তি দেখাচ্ছেন, যা নৌকার প্রার্থীদের জন্য ভাবনার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনের পাঁচটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্তিশালী। এর মধ্যে রাজশাহী—৪ (বাগমারা) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য এনামুল হক। তিনি বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। গত তিনবার তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হয়েছেন। রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যাঁরা নৌকা প্রতীক পেয়েছেন, তাঁরা নৌকা নিয়ে নির্বাচন করবেন। অন্যরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। কাউকে বহিষ্কার করা হবে না। নির্বাচন হবে উৎবমুখর। রাজশাহীতে সেটাই হচ্ছে।
নওগাঁর ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই দলীয় স্বতন্ত্রদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন নৌকার প্রার্থীরা। নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মালেক নিজেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে তা প্রত্যাহার করে নেন। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, যেসব আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁরা ভোটকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছেন। দল মনোনীত প্রার্থীরা কিছুটা বেকায়দায় পড়লেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যাঁরা নৌকা প্রতীক পেয়েছেন, তাঁরা নৌকা নিয়ে নির্বাচন করবেন। অন্যরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। কাউকে বহিষ্কার করা হবে না। নির্বাচন হবে উৎবমুখর। রাজশাহীতে সেটাই হচ্ছে। ফরিদপুরের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে শক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে গত দুটি নির্বাচনে ফরিদপুর—৪ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন)। দুবারই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহকে হারিয়েছেন। এবারও জাফর উল্যাহকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন নিক্সন।
বরিশালের তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্তিশালী। এর মধ্যে উচ্চ আদালতে গিয়ে নিজের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন বরিশাল—৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। তিনি বরিশালের সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। এ আসনের আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাহ উদ্দিনও (রিপন) শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী।
মাদারীপুর—৩ আসনে নৌকার প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুস সোবহান মিয়া (গোলাপ)। তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বেগমকে। তাহমিনা সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। চট্টগ্রাম—১২ আসনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও হুইপ সামশুল হক চৌধুরী। এখানে দলীয় প্রার্থী দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পটিয়া উপজেলার সদ্য পদত্যাগকারী চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী। এ ছাড়া চট্টগ্রাম—১ (মিরসরাই), চট্টগ্রাম—২ (ফটিকছড়ি), চট্টগ্রাম—৮ (বাকলিয়া—চান্দগাঁও), চট্টগ্রাম—১০ (হালিশহর, পাহাড়তলী, খুলশী, ডবলমুরিং), চট্টগ্রাম—১১ (বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গা), চট্টগ্রাম -১৪(চন্দনাইশ) চট্টগ্রাম—১৫ (সাতকানিয়া—লোহাগাড়া) আসনেও প্রভাবশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন।
ময়মনসিংহ জেলার ১১টি আসনের ৬টিতে, জামালপুরের ৫টি আসনের ২টিতে, শেরপুরের ৩টির ১টিতে এবং নেত্রকোনার ৫টি আসনের ৪টিতে নৌকার প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন। অবশ্য পিরোজপুর—১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আবদুল আউয়াল। এই দুই প্রার্থীর কর্মী—সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতে ইতিমধ্যে একজন মারা গেছেন। একইভাবে ঢাকা—১৯ আসনে নৌকার প্রার্থী দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমানের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং (মুরাদ জং)। গাজীপুর—১ আসনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কালিয়াকৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম। এ রকম অন্তত ১৫ জন মন্ত্রী—প্রতিমন্ত্রীর আসনে শক্তিশালী দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন বলে জানা গেছে।
শেয়ার করুন:

Recommended For You